ট্রাম্পের পর পুতিনের বেইজিং সফর: বিশ্বরাজনীতির নতুন সমীকরণ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 20 May, 2026
একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সপ্তাহের সাক্ষী হলো বেইজিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের ঠিক এক দিন পরেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বেইজিংয়ে পা রেখেছেন।
আপাতদৃষ্টিতে এই সফরের আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য ২০০১ সালের ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তি উদ্যাপন হলেও, এর আসল গুরুত্ব লুকিয়ে আছে বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি এবং সময়ের কূটনীতিতে।
একই সপ্তাহে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুই পরাশক্তিকে আতিথেয়তা দিয়ে চীন বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গলবার রাতে বেইজিংয়ে পৌঁছান। এরপর তাঁর মূল আনুষ্ঠানিকতা হবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ২৫ বছরের পুরোনো একটি চুক্তির স্মরণোৎসবে যোগ দেওয়া। চুক্তিটি মূলত ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’ নামে পরিচিত।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বুধবার সকালে সি–পুতিনের বৈঠকের গুরুত্ব অনেক বেশি। একই সঙ্গে এ সফরের সময়টাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
গত সপ্তাহে চীনে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প বেইজিং ছাড়ার মাত্র এক দিন পরই পুতিনের এ সফরের ঘোষণা আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করছে যে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এখন ওয়াশিংটন থেকে ক্রমে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে এসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। ট্রাম্প বড় বড় বাণিজ্য চুক্তির কথা প্রচার করলেও, তাইওয়ান সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ নিয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে কোনো বড় ছাড় বা আশ্বস্ততা পাননি।
ট্রাম্প বেইজিং ছাড়ার পরপরই পুতিনের আগমন মস্কোর আত্মবিশ্বাসকেই প্রতিফলিত করে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা কোনঠাসা হলেও, পুতিন ভালো করেই জানেন যে চীন তাকে বাদ দিয়ে বৈশ্বিক সমীকরণ মেলাবে না। আর তাই এই সফরটি রাশিয়ার জন্য একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি।
"ট্রাম্প যেমনটা কিছু পাওয়ার আশায় বেইজিংয়ে গিয়েছিলেন, পুতিনও ঠিক সে জন্যই গেছেন। তবে তফাত হলো, সব কার্ডই এখন চীনের হাতে।"
চীন-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীরতা: 'অংশীদার, কিন্তু সামরিক মিত্র নয়'
লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষক মেরিনা মিরনের মতে, এই সফর থেকে তাৎক্ষণিক কোনো যুগান্তকারী ঘোষণার সম্ভাবনা কম, তবে এটি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।
জ্বালানি সমীকরণ: চীন বর্তমান সংকটে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল ছাড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস নিশ্চিত করতে চায়।
প্রযুক্তি ও ড্রোন: পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া তাদের সামরিক ও ড্রোন প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ (বেসামরিক ও সামরিক) চীনা প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ওলেগ ইগনাতভ মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তারা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হলেও প্রথাগত 'সামরিক মিত্র' নয়। তাদের এই বন্ধনের মূল ভিত্তি হলো একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order) গড়ে তোলা, যেখানে একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থাকবে না।
ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: আগামী দিনের বিশ্বচিত্র
২০২৬ সালের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান (অপারেশন এপিক ফিউরি) এবং ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা এই দুই নেতার বৈঠকের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
[ইরান যুদ্ধ ২০২৬] ➔ [হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ] ➔ [বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট]
|
+---------------------------------+---------------------------------+
| |
[চীনের ওপর প্রভাব] [রাশিয়ার ওপর প্রভাব]
চীন তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৫০% উপসাগরীয় জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত
এই রুট দিয়ে আমদানি করে। বৈশ্বিক মন্দা হওয়ায় রাশিয়া স্বল্প মেয়াদে বাড়তি মুনাফা
চীনের রপ্তানি বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এবং কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে।
চ্যাথাম হাউসের তথ্যমতে, ট্রাম্প চীনের কাছে ইরান যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে যে মধ্যস্থতা চেয়েছিলেন, বেইজিং তা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। চীন তেহরান বা মস্কো—কাউকেই হাতছাড়া করতে রাজি নয়, যা রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং ন্যাটোর (NATO) বর্তমান অবস্থা
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর জন্য এক বিরাট পরীক্ষা। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন জড়িয়ে পড়া—সব মিলিয়ে ইউরোপ এক দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU): মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে ইউরোপে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং একক সিদ্ধান্ত ইউরোপকে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে, যা ইইউর ভেতরে এক ধরনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের (Strategic Autonomy) জন্ম দিচ্ছে।
ন্যাটো (NATO): এশিয়া-প্যাসিফিকে চীনের উত্থান এবং ইউরোপে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে ন্যাটো দুইমুখী চাপের মুখে। মার্কিন প্রশাসন ইরানের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ায় ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যরা নিজেদের পূর্ব সীমান্ত (রাশিয়া সংলগ্ন অঞ্চল) নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। চীন-রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান অক্ষ ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।
বেইজিং এখন বিশ্ব রাজনীতির ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’
বিশ্লেষকেরা এই ধারাবাহিক সফরগুলোকে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের বড় প্রদর্শনী হিসেবে দেখছেন।
ইউক্রেন বা ইরান ইস্যুতে চীন অন্তত প্রকাশ্যে কোনো এক পক্ষের হয়ে মাঠে নামেনি। তারা নিজেদের একজন "নিরপেক্ষ পরাশক্তি" এবং অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চীন সবসময়ই শান্তিপূর্ণ আলোচনার কথা বলে আসছে। গবেষক মেরিনা মিরনের মতে, চীন কখনোই চাইবে না রাশিয়া এই যুদ্ধে অপমানজনক পরিস্থিতির মুখে পড়ুক। তাই তারা মস্কোকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেবে না।
বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বেইজিং
পুতিনের এই সফর থেকে হয়তো কোনো নাটকীয় চুক্তি বা যৌথ সামরিক ঘোষণার খবর আসবে না, তবে এর প্রতীকী মূল্য অপরিসীম।
পরপর দুই দিনে বিশ্বের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে বেইজিংয়ে আতিথেয়তা দিয়ে চীন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বর্তমান এবং আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থায় বেইজিংকে উপেক্ষা করে কোনো বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব।
ওয়াশিংটনের একমেরু বিশ্ব ধারণাকে পাশ কাটিয়ে বিশ্ব এখন নিশ্চিতভাবেই একটি জটিল বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

